সময়ের গভীরে জমে থাকা ধুলো ঝেড়ে যখন পুরনো একটা গল্প জীবন্ত হয়ে ওঠে, তখন তা আর কেবল গল্প থাকে না—তা হয়ে ওঠে আত্মার আর্তি, চোখের জল, কিংবা মন থেকে উঠে আসা কোনো দীর্ঘশ্বাস। পরিচালক সুমন ঘোষের ‘পুরাতন’ ঠিক তেমনই এক সেলুলয়েড সৃষ্টি, যেখানে সম্পর্কের অন্তর্দ্বন্দ্ব আর স্মৃতির আবেশ এক হয়ে জড়িয়ে ধরে আমাদের।
দেবীর আরেক রূপ
সত্যজিতের ‘দেবী’ যদি ছিল এক বিশ্বাসের লড়াই, তবে সুমনের ‘পুরাতন’ যেন তারই অতলে হারিয়ে যাওয়া প্রতিধ্বনি। শর্মিলা ঠাকুর, যাঁকে আমরা এক সময়ের দেবী রূপে চিনি, এবার ফিরেছেন এক স্মৃতিভ্রষ্টা বৃদ্ধার চরিত্রে। গঙ্গার পাশের পুরনো এক বাড়িতে তিনি বাঁচেন, বাঁচেন না—বলাও যায় না। তাঁর কাছে সময় এক বন্ধ বাক্স, যা খুললে পুরনো হারমোনিয়ামের শব্দ, রেডিয়োর ফাটল ধরা কণ্ঠ, কিংবা আটাত্তরের কোনো চিঠি ভেসে আসে।
ঋতুপর্ণার সম্পর্ক সংকট
ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত অভিনীত ‘ঋতিকা’ চরিত্রটি আমাদের আধুনিক নারীদের প্রতিচ্ছবি। বহুজাতিক সংস্থায় কাজ করেও যার ভিতরে চলে সম্পর্ক আর দায়িত্বের টানাপোড়েন। মা, প্রেমিক, অতীত, ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে যে সংগ্রাম, তা কেবল চরিত্রের নয়, আমাদের সমাজের বহু নারীর জীবনেরও।
চোখে জল আনা মুহূর্তগুলো
এই ছবিতে কিছু দৃশ্য আছে যেগুলো রীতিমতো হৃদয় ভেঙে দেয়। মায়ের জন্মদিনে মেয়ে যখন পুরনো কিছু স্মৃতিচিহ্ন উপহার দেয়, তখন তার মধ্যে লুকিয়ে থাকে এক অভিব্যক্তিহীন আর্তনাদ। সেই মুহূর্তে চোখ ভিজে যায়, মনে পড়ে যায় নিজের হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোকে।
একটি বাড়ি, একটি বাক্স, একটি সময়
পুরনো বাড়িটি এই ছবির আরেক চরিত্র। খসে পড়া পলেস্তারা, শ্যাওলা ধরা দেয়াল—সব কিছু যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আর একটি ছোট বাক্স—যেটি হয়তো কয়েক মুহূর্তের জন্য এসেছে, কিন্তু রেখে গেছে হাজার প্রশ্ন।
বাংলাদেশি দর্শকের চোখে
বাংলাদেশি দর্শক হিসেবে এই ছবি আমাদের কাছে আরও প্রাসঙ্গিক। এই উপমহাদেশের প্রতিটি ঘরেই একেকটি ‘পুরাতন’ লুকিয়ে আছে। আমাদের মা, খালা, নানি—সবার মনের গভীরে এমন এক গল্প আছে, যেটা বলা হয় না, শোনা হয় না, শুধু অনুভব করা যায়।
.png)